বিবরণ:

বাংলাদেশে মানব বসতির প্রাচীনতম স্থান সীতাকুন্ড একই সাথে প্রাচীন ইতিহাস গাঁথা ও প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্যে ভরপুর। এই অঞ্চলের গঠন চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে পশ্চিম প্রান্তের অন্যতম ভূতাত্ত্বিক গঠন। এর উত্তরে ফেনী নদী, দক্ষিণে কর্ণফুলী নদী, পূর্বে হালদা নদী ও পশ্চিমে সন্দ্বীপ চ্যানেল রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য এই সীতাকুন্ডের নামকরণের সাথে বহু পৌরাণিক গল্প জড়িত। ধারণা করা হয় রামায়ণে বর্ণিত রামের স্ত্রী সীতার নামানুসারে এই স্থানের নাম হয় সীতাকুন্ড। অপর একটি আখ্যান অনুসারে, দক্ষরাজার কন্যা পার্বতী মা বাবার অগোচরে ভালবেসে বিয়ে করেন শিবকে, এতে রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে ত্রিলোকের সবাইকে আমন্ত্রন জানান। সেখানে শিবকে অপদস্ত করার জন্য তার মূর্তি বানিয়ে রাজপ্রাসাদের তোরণের বাইরে প্রহরী হিসাবে রাখা হল। নারদ মুনি থেকে পার্বতী একথা জানতে পেরে নিজেই তা দেখতে গেলেন এবং লজ্জায় অপমানে দেহত্যাগ করলেন। পার্বতী বেচে নেই জেনে উম্মত্তপ্রায় শিব পার্বতীর মৃতদেহ মাথায় নিয়ে প্রলয় নাচন শুরু করেন। এক পর্যায়ে বাহান্ন খন্ডে খন্ডিত পার্বতীর দেহ বাহান্ন স্থানে নিক্ষিপ্ত হয়ে তীর্থ কেন্দ্রের উদ্ভব হয়। সতী পার্বতীর উরুসন্ধীর অংশ এখানে এসে পড়েছিল বলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে সীতাকুন্ড তীর্থস্থান রূপে গণ্য হয়। চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত সীতাকুন্ড উপজেলাটি মূলত কৃষি প্রধান অঞ্চল হলেও এখানে রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প। সমগ্র পৃথিবী থেকে বিশালাকৃতির পরিত্যক্ত সব জাহাজ এখানে নিয়ে এসে ভাঙ্গা হয় এবং জাহাজের বিভিন্ন অংশ ব্যবহৃত হয় নানা রকম কাজে।


আকর্ষণ:

মেঘ, পাহাড়, ঝর্ণা, সমুদ্র ও সবুজের অপরূপ মিতালি সীতাকুন্ডে এলে দেখতে পাওয়া যায়। উপকূলীয় বনাঞ্চল নিয়ে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক। সীতাকুন্ডের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ হিমালয় হতে বিচ্ছিন্ন হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলীয় অংশ চন্দ্রনাথ পাথাড় এবং পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সনাতন ধর্মের বিখ্যাত শক্তিপীঠ চন্দ্রনাথ মন্দির, বার আউলিয়া দরগাহ শরীফ, বিস্তীর্ণ গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত, ব্যসকুন্ড, সহস্রধারা, সুপ্তধারা ঝর্ণা, সুলতানী আমলে নির্মিত হাম্মাদিয়ার মসজিদ, হাজারিখিল ও বাড়ৈয়াঢালা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ইত্যাদি। এছাড়াও সন্দ্বীপ চ্যানেলের সমুদ্র বন্দরে অবস্থিত জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প। এখানে শ্রমজীবী মানুষদের জীবন ও জীবিকার লড়াই চলতে থাকে। বিশাল বিশাল জাহাজের বিভিন্ন অংশ ভেঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কৌশল দেখতে পারাও আপনার জীবনে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা যোগ করতে পারে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একদিনে ঘুরে আসা যায় বলে সীতাকুন্ড বর্তমানে ভ্রমণপ্রিয়দের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে সীতাকুন্ড ও এর আশেপাশের সব স্থান ভ্রমণ করতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই সেখানে কয়েকদিন থাকতে হবে। সীতাকুন্ডের আশেপাশে অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো হলো, বড় কলমদহ, ছোট কলমদহ, হরিণমারা ঝর্ণা, নাপিত্তাছড়া, খৈয়াছড়া, বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত ইত্যাদি।