বিবরণ:

সুন্দরবন বলতে অনেকেই জানে দুই পাশে ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে যাওয়া সরু খালের কথা। কখন বাঘ আসে এই উৎকণ্ঠা নিয়ে অজানা অচেনা পাখপাখালির কিচিরমিচির শুনতে শুনতে এগিয়ে চলা, গভীর বনে ভিতর হঠাৎ দেখা যায় বানর, হরিণ পাল এবং নানা রকম বন্য প্রাণীর পানি পান করতে আসার দৃশ্য। ট্রলার বা লঞ্চে যেতে যেতে কখনো আবার শুশুক এর খেলা করার দৃশ্য চোখে পড়ে। এভাবে সুন্দরবন ভ্রমণের বড় একটা অংশ কেটে যায় নদী আর খালেই। এই সুন্দরবনে যে সমুদ্রসৈকত ও আছে তা কিন্তু অনেকেই জানে না। সুন্দরবনের দক্ষিণ পূর্বকোণে মংলা বন্দর থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরে কটকায় রয়েছে এই সমুদ্র সৈকত। সৈকত এলাকায় ছোট বড় প্রচুর জামগাছের জন্যই এর নামকরণ করা হয়েছে জামতলা সমুদ্র সৈকত। এ সৈকত যেন এক বুনো সুন্দরী। মনোরম চিত্রা হরিণের দল, বিভিন্ন জাতের পাখি, শান্ত প্রকৃতি এবং বিভিন্ন বন্য প্রাণীর উপস্থিতির কারণে পর্যটকদের কাছে কটকা অভয়ারণ্যের তাৎপর্যই আলাদা।


পরামর্শ:

জামতলা বা কটকা সমুদ্র সৈকত হল বাংলাদেশের সবচেয়ে বিপদজনক সমুদ্র সৈকত। কটকা সৈকতটি সোজা পূর্বদিকে কচিখালিতে গিয়ে মিশেছে। এই সৈকতে ঢেউয়ের আকার অত্যন্ত পরিবর্তনশীল এবং অজ্ঞাত চোরাবালি জন্য পানিতে নামা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। সাময়িক আনন্দের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রের পানিতে গোসল করবেন না।

যাত্রার শুরুতে লঞ্চে উঠার আগে সাথে হালকা নাস্তা নিয়ে নিতে পারেন। তবে অবশ্যই খাবারের প্যাকেট বা অন্যান্য বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলে আসবেন না। আমাদের দেশের দর্শনীয় স্থান গুলোর সৌন্দর্য রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব।


আকর্ষণ:

কটকা খালের পশ্চিম পাড়ের জেটি পেরিয়ে উপরে উঠলেই বন কার্যালয়। বনবিভাগ কার্যালয়ের পেছন দিক থেকে সোজা পশ্চিমমুখী কাঠের তৈরি ট্রেইলের উত্তর পাশের খালটিতে ভাটার সময় ম্যানগ্রোভ জাতীয় উদ্ভিদের ঘন শ্বাসমূল দেখা যায়। এ ছাড়া একটু নিরিবিলি স্থানে যেতে পারলে দেখা যায় চিত্রা হরিণের দল। বনের দক্ষিণে কিছুক্ষণ হাঁটলে চোখে পড়বে পরপর তিনটি টাইগার টিলা। এ টিলায় প্রায়ই বাঘের পায়ের ছাপ দেখা যায়। টাইগার টিলা থেকে সামান্য পশ্চিমে বয়ার খাল। খালের দুই পাশ কেওড়া, গোলপাতা আর নানান পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে আছে চারপাশ। এছাড়া কটকার জেটির উত্তরে খালের চরজুড়ে থাকা কেওড়ার বনেও দেখা মেলে দলবদ্ধ চিত্রা হরিণ, বানর আর শূকরের। আবার শীতের সময় দেখা মিলে যেতে পারে রোদ পোহানো লোনা জলের কুমির। কটকা বন কার্যালয়ের ঠিক ওপারে একটি ছোট খাড়ি চলে গেছে সোজা পূর্ব দিকে। এই পথে কিছু দূর যাওয়ার পরে হাতের ডানে ছোট্ট জেটি এবং ওপরে ওয়াচ টাওয়ার। কটকার ওয়াচ টাওয়ারটি চারতলা বিশিষ্ট। ৪০ ফুট উঁচু টাওয়ার থেকে উপভোগ করা যায় সুন্দরবনের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। টাওয়ারের পশ্চিম পাশে ঘন জঙ্গল। পূর্বে এবং দক্ষিণে দীর্ঘ ছন বন। বিকেলে এখানে দল বেঁধে হরিণেরা আসে খাবার খেতে। ওয়াচ টাওয়ারে চুপি চুপি কিছুক্ষণ বসে থাকলে সে দৃশ্য দেখা যায়। বনের মাঝে একটি মিঠা জলের পুকুর আছে। এই পুকুরের পানি পান করেন কর্মরত কোস্টগার্ড, ফরেস্ট অফিসার ও স্থানীয় জেলেরা। কটকা ওয়াচ টাওয়ারটিকে পিছনে ফেলে সোজা উত্তরে প্রায় তিন কিলোমিটার ঘন সুন্দরী, গেওয়া, গরান, এবং কেওড়ার বন পেরিয়ে সমুদ্র সৈকতে যেতে হয়ে। জামতলা সমুদ্র সৈকতের পথে শুধু ম্যানগ্রোভ বন নয়, ফার্নের ঝোঁপও পাড়ি দিতে হয় খানিকটা। এই রাস্তাতেই হরিণ পালদের বিচরণ, শুকরের ছোটাছুটি, বানরের কারসাজি, বাঘের হরিণ শিকার কিংবা রাজকীয় ভঙ্গিতে বাঘের চলাচল। জামতলা সৈকতটি নির্জন ও পরিচ্ছন্ন। বেলাভূমিতে কালো বালি চিকচিক করে আর প্রচুর কাঁকড়া দেখতে পাওয়া যায়। সিডরে বিধ্বস্ত গাছপালার অংশবিশেষ এখনো আছে সৈকতজুড়ে। সন্ধ্যার আকাশে সাত রঙ ছড়িয়ে অপূর্ব সৌন্দর্য সৃষ্টি করে সূর্য অস্ত যাওয়ার মনমাতানো দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় এখানে।




একটুখানি কেনাকাটা

কোনো স্থানে ভ্রমণ করতে গিয়ে হালকা কেনাকাটা না করলে যেন ভ্রমণের আনন্দই অসমাপ্ত রয়ে যায়। তাই বাঘের দেশ থেকে আপনি নিয়ে আসতে পারেন সুন্দরবনের খাঁটি চাকভাঙ্গা মধু। খুলনার বাগেরহাটে এই মধু পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া জামের মৌসুমে জাম ছাড়াও অন্যান্য সময়ে বিভিন্ন ফলফলাদিও পাওয়া যায় এখানে। আপনি যদি শিল্পী মনোভাবাপন্ন মানুষ হয়ে থাকেন তাহলে ঘর সাজানোর জন্য স্থানীয় গ্রামবাসীদের হাতে বানানো নানা শিল্পকর্ম কিনতে পারেন স্মৃতি স্বরূপ।