চট্টগ্রাম

বড় পাথর, থানচি

Written by admin

নীলাভ সবুজ সাঙ্গু নদীর রেমাক্রি ঝিরিতে ইতিউতি ছড়িয়ে আছে বিশাল আকৃতির সব পাথর। কোনো কোনো পাথরের উচ্চতা একমানুষ ছাড়িয়ে আরোও উপরে উঠে গেছে। এ যেন এক দৈত্য পাথরের রাজত্ব। বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নে সাঙ্গু নদীর বুকে অবস্থিত এই পাথর রাজ্য। নাম তার বড় পাথর। নানা পৌরানিক গল্পকাহিনী ও এখানকার অধিবাসীদের ধর্মবিশ্বাসে এই অঞ্চলটিতে যুক্ত হয়েছে এক পূজনীয় সৌন্দর্য। স্থানীয়দের মধ্যে বড় পাথর এলাকাটিকে ঘিরে প্রচলিত আছে নানারকম গল্প। সাঙ্গুর এই পাথরের রাজ্য একসময় ছিল রক্ত মাংসের মানুষের রাজ্য। খরস্রোতা সাঙ্গু নদীতে ভেসে যান রাজকুমার। পুত্রশোকে কাতর হয়ে রাজা রাণী পাথরে পরিণত হন। ধীরে ধীরে সমগ্র রাজ্যবাসী পাথরে পরিণত হয়। 

কারো কারো মতে আবার রাজা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এই জায়গায় এসে আশ্রয় নেয়। এবং পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে পাথরে পরিণত হয়েছেন। স্নেহ, ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও বীরত্ব মাখা এমনই সব ইতিহাসের কাহিনী প্রচলিত আছে এই অঞ্চলকে ঘিরে। তবে মূলত বহু বছর আগে ভূমিকম্পে পাহাড় ধ্বসে বড় বড় পাথরের এই টুকরোগুলো নদীতে এসে পড়েছে। পত্তন ঘটেছে আজব এই স্বর্গরাজ্যের। 

আর সাঙ্গু নদীর বুকে গড়ে উঠা এই আশ্চর্য বড় পাথর অঞ্চলের সবচেয়ে বড় পাথরের নাম হলো রাজা পাথর বা বন্দপাথর। কথিত আছে, ভ্রমণের সময় এ পাথরটার উপর মুকুট রেখে বিশ্রাম করছিলেন রাজা। এর পর থেকে এর নাম হয়ে গেছে রাজাপাথর। মারমা ভাষায় ‘বন্দ’ অর্থ মুকুট বা রাজার মুকুট। প্রতি বছর সাঙ্গু নদীর উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে গিয়ে প্রচুর মানুষের মৃত্যু ঘটে। রাজা পাথর কোনো কারণে রুষ্ঠ হলেই এই হত্যাকান্ড ঘটান বলে তাদের দৃঢ় বিশ্বাস। তাইতো পাহাড়ের অধিবাসিরা এইসব পাথরের পুজো করে থাকে। পাথরটির মধ্যখানে রয়েছে একটি বড় গর্ত। গ্রামবাসীরা মোম জ্বালিয়ে পুজা অর্চনা করে। অনেকে এখানে টাকা পয়সা রেখে যায়, মানত করে। বিপদের সময় ফের এখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা-পয়সা ধার নেয় মানতকারী। পরে সুবিধামতো ধার করা টাকা ফেরত দেয় পাথরের গর্তে। এছাড়াও রয়েছে কলসপাথর, বাঘপাথর ইত্যাদি নামের নানা আকৃতি ও বৈশিষ্টের পাথর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব পাথরের গল্পের সাথে লোকের বিশ্বাস মিলিত হয়ে গড়ে উঠেছে পাথর পুরাণ।

কি দেখবেন?

বড় পাথর অঞ্চলটি নদীর মাঝে অবস্থিত একটি অপরূপ রাজ্য। বান্দরবানের তিন্দুতে অবস্থিত বেশিরভাগ দর্শনীয় স্থানে যেতে হলে এই স্থান হয়ে যেতে হয়। নদীর উজানে ঘন্টাখানেক দূরত্বে আছে রেমাক্রি। বড় পাথর অঞ্চল ভ্রমণের সাথে নাফাখুম, আমিয়াখুম যেতে পারেন ও সাজিয়াপাড়ায় রাত্রিযাপন করতে পারেন। তিন্দু বাজারের কাছে রয়েছে কুমারী ঝর্ণা। এককথায় প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্যে ভরপুর থাকবে তিন্দু ভ্রমণ। তিন্দুতে যাওয়ার পথে নীলগিরি ও নীলাচল যাওয়ার রাস্তা পড়বে। মন চাইলে সেখানেও ঘুরে আসতে পারেন।

কিভাবে যাবেন?

বড় পাথর যাওয়ার জন্য সবার প্রথমে আপনাকে ঢাকা থেকে বান্দরবান যেতে হবে। ঢাকা থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে শ্যামলী পরিবহন, হানিফ পরিবহন, ইউনিক, এস আলম ইত্যাদি পরিবহন সেবা রয়েছে। নন এসি বাসে জনপ্রতি ভাড়া ৫৫০ টাকা এবং এসি বাসের ক্ষেত্রে জনপ্রতি ৯৫০ টাকা করে। বান্দরবান জেলা থেকে চাঁদের গাড়ি ভাড়া করে থানচির উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করতে খরচ হবে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। এছাড়া লোকাল চাঁদের গাড়িতে করেও থানচি যেতে পারেন। এক্ষেত্রে ভাড়া লাগবে ১০০ টাকা থেজে ১৫০ টাকা করে। রাস্তার দুই পাশে মনমাতানো দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন তা বুঝতেই পারবেন না। থানচি পৌঁছে সবার আগে আপনাকে বিজিবি ক্যাম্পে আপনার নাম, পরিচয়, যোগাযোগের ঠিকানা ইত্যাদি প্রদান করে অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। এখান থেকে একজন গাইড ঠিক করে নিবেন। গাইডের জন্য ৫০০ টাকার মত প্রদান করতে হবে। থানচি বাজার থেকে নৌকা ভাড়া করে নিবেন। প্রতিদিনের জন্য ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করতে আটশ টাকা থেকে নয়শ টাকা খরচ হবে। একটি নৌকায় ৫ জনের বেশি উঠা নিষেধ। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী নৌকা ভাড়া করে নিবেন। যাত্রার আগে থানচি বাজার থেকে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট ভাড়া নিয়ে নিবেন।

কোথায় খাবেন?

ঢাকা থেকে বান্দরবান পৌঁছে সকালের নাস্তা করে নিতে পারেন। থানচি বাজারে পৌঁছে দুপুরের খাবার খেয়ে নিবেন। থানচি বাজারে খাবারের হোটেল রয়েছে। বড় পাথরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার আগে হালকা নাস্তা ও খাবার পানি নিয়ে নিবেন। এইসব জায়গায় খাবারের সুব্যবস্থা নেই। তাই সাথেই কিছু হালকা খাবার বহন করা ভালো। রাতে থাকার পরিকল্পনা থাকলে থানচি বাজার থেকে বাজার করে নিয়ে এসে নিজেরা রান্না করে খেতে পারেন। আদিবাসী ঘর গুলোতে প্রতিবেলা খেতে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা খরচ হতে পারে। শঙ্খ নদীর তাজা মাছ কিংবা পাহাড়ী মুরগী, ডাল ও আলুভর্তা দিয়ে ভাত খেতে পারবেন।

কোথায় থাকবেন? 

তিন্দুতে থাকার ব্যবস্থা বলতে গেলে আদিবাসীদের বাঁশ কাঠের মাচাং ঘর। মারমাদের ঘরগুলোতে প্রতিদিন থাকার খরচ জনপ্রতি ১৫০টাকা মাত্র। তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা মেম্বারের তৈরী বাংলোতেও থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ইচ্ছে করলে তাবু নিয়ে গিয়ে ক্যাম্পিং করেও রাত কাটাতে পারেন। 

সতর্কতা 

১. নিচের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের কয়েকটি ফটোকপি ও কয়েক কপি ছবি সাথে রাখবেন। বিজিবি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নেয়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। 

২. উত্তাল সাঙ্গু নদীতে শীতকাল ছাড়া অন্য যেকোনো সময়ে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সাথে রাখবেন।

৩. থানচি বাজার থেকে হালকা কিছু নাস্তা ও খাবার পানি নিতে ভুলবেন না।

৪. তিন্দুতে সব মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করেনা। কিছউ জায়গায় রবি ও এয়ারটেল এর নেটওয়ার্ক হালকা কাজ করে।

৫. তিন্দুতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। সুতরাং সাথে করে পাওয়ার ব্যাঙ্ক নিয়ে নেয়া ভালো।

৬. ভালো মানের ট্রেকিং এর জুতা পরিধান করবেন।

৭. সাঙ্গু নদীতে নদীর স্রোত খুব বেশি। নদীতে সাঁতার বা গোসল করার ব্যাপারে সচেতন থাকবেন।

৮. স্থানীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানে এমন কোনো কাজ করবেন না। তাদের সাথে অশালীন আচরণ করা থেকে বিরত থাকুন।

৯. কোনো প্রকার প্যাকেট, প্লাস্টিক কিংবা ময়লা আবর্জনা ফেলে পরিবেশের সৌন্দর্য নষ্ট করবেন না।

Leave a Comment

Our new website now under construction, It will coming soon. Do you like to get notify when the new version will be on live?

Subscribe for notifications.

You have successfully subscribed to the newsletter

There was an error while trying to send your request. Please try again.

Bangladesh Tourism Guide will use the information you provide on this form to be in touch with you and to provide updates and marketing.