CHAPAINAWABGANJ

দারাসবাড়ি মসজিদ, শিবগঞ্জ

Written by admin

বহুকাল ধরে ঔপনিবেশিক শাসনের হাজারো নিদর্শন ও গৌরবগাঁথা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের দেশে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত দারাসবাড়ি মসজিদটিও এই বাংলায় মুসলিম শাসনামলের অভুতপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর প্রথম যুগের একটি নিদর্শন। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে দীর্ঘদিন মাটি চাপা পড়ে থাকা এই মসজিদ খনন করে উদ্ধার করা হয়। ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা যায়, মুনশী এলাহী বখ্শ কর্তৃক আবিষ্কৃত একটি আরবী শিলালিপি অনুযায়ী ১৪৭৯ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরী ৮৮৪) সুলতান শামস উদ্দীন ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এই মসজিদ এর নাম ছিল ফিরোজপুর। ১৫০২ খ্রিষ্টাব্দে যখন সুলতান হোসেন শাহ্ কর্তৃক দারুসবাড়ী বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত হয় তখন অত্র অঞ্চলের নামে মসজিদটির নামকরণ করা হয় দারুসবাড়ি জামে মসজিদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ছোট সোনা মসজিদের সন্নিকটে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে এই মসজিদের অবস্থান। 

টেরাকোটা ইট দিয়ে তৈরি দারাসবাড়ি মসজিদটির সাথে ভারতের চামচিকা মসজিদের অনেক সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। দিঘীর পাড়ে গাছপালায় ঘেরা ইট নির্মিত এই মসজিদের অভ্যন্তরের আয়তক্ষেত্র দুই অংশে বিভক্ত। মসজিদের দেয়ালের পুরুত্ব বেশি হওয়ার কারণে চৈত্রের প্রচন্ড গরমেও ভিতরে শীতল পরিবেশি বিরাজ করে। এর আয়তন ৯৯ ফুট ৫ ইঞ্চি, ৩৪ ফুট ৯ ইঞ্চি। পূর্ব পার্শ্বে একটি বারান্দা, যা ১০ ফুট ৭ ইঞ্চি। বারান্দার খিলানে ৭টি প্রস্তর স্তম্ভের উপরের ৬টি ক্ষুদ্রাকৃতি গম্বুজ এবং মধ্যবর্তীটি অপেক্ষাকৃত বড় ছিল। উপরে ৯টি গম্বুজের চিহ্নাবশেষ রয়েছে। উত্তর দক্ষিণে ৩টি করে জানালা ছিল। উত্তর পশ্চিম কোণে মহিলাদের নামাজের জন্য প্রস্তরস্তম্ভের উপরে একটি ছাদ ছিল। এর পরিচয় স্বরূপ এখনও একটি মেহরাব রয়েছে। পশ্চিম দেয়ালে পাশাপাশি ৩টি করে ৯টি কারুকার্য খচিত মেহরাব রয়েছে। এই মসজিদের চারপার্শ্বে দেয়াল ও কয়েকটি প্রস্তর স্তম্ভের মূলদেশ ব্যতীত আর কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই। এখানে প্রাপ্ত তোগরা অক্ষরে উৎকীর্ণ ইউসুফি শাহী লিপিটি এখন কোলকাতা জাদুঘরে রক্ষিত আছে।

কি দেখবেন?

অতীত গৌরবে সমৃদ্ধ এবং সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। ইসলামী স্থাপত্যকলার অজস্র নিদর্শন বুকে ধরে রাখা চাঁপাইনবাবগঞ্জ এক সময় ছিল প্রাচীন বাংলার এক উল্লেখযোগ্য জনপদ গৌড়ের রাজধানী। ঐতিহ্যবাহী ছোট সোনামসজিদ (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত), শাহ্ সুজার কাছারী বাড়ি (১৬৩৯-৬৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত) হযরত শাহ্ নেয়ামতুল্লাহ (রঃ) এর মাজার ও তাহখানা মসজিদ (১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত) খঞ্জনদীঘির মসজিদ, চাঁপাই জামে মসজিদ প্রভৃতি স্থাপত্যকলা এবং মকরমপুর ঘাটে বল্লাল সেন কর্তৃক নির্মিত শ্মশানবাড়ির ধ্বংসাবশেষ (১১৫৮-৭৯ খ্রিস্টাব্দে) নওদা-বুরুজ বা ষাঁড়-বুরুজ (১১৭৯-১২৩৫ খ্রিঃ এ নির্মিত), নাধাইয়ের জমিদার বাড়ি, নাচোলের রাজবাড়ি, জোড়ামঠ প্রভৃতি স্থাপত্যকলার নিদর্শন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহাসিক গুরুত্বের পরিচায়ক। এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে বাংলার গৌরবময় অতীতে। এছাড়াও এখানে রয়েছে অপার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের উৎস বাবু ডাইং, তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা,  আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ইত্যাদি ভ্রমণ উপযোগী স্থান।

কিভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাধারনত সড়ক পথেই যাতায়েত করা হয়ে থাকে। ঢাকা থেকে ন্যাশনাল ট্রাভেলস, দেশ ট্রাভেলস, গ্রামীণ ট্রাভেলস ইত্যাদি বাস এখানে নিয়মিত চলাচল করে। নন এসি বাস এর ভাড়া জনপ্রতি মাত্র ৫৬০ টাকা। এসি বাস এর ক্ষেত্রে প্রতি টিকেটের দাম ১১০০ টাকা মাত্র।

এছাড়া ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বিমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে চাইলে প্রথমে রাজশাহীতে আসতে হবে। ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে রবিবার ব্যতীত সপ্তাহের ৬ দিন দুপুর ২ টা ৪০ মিনিটে সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ট্রেন রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এছাড়া, পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেন মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ১১ টা ১০ মিনিটে রাজশাহীর জন্য ঢাকা ত্যাগ করে। এসব ট্রেনে শ্রেণিভেদে ভাড়া বিভিন্ন, শোভন চেয়ার ৩৫০ টাকা, স্নিগ্ধা ৬০৪ টাকা, এসি সিট ৭২৫ টাকা এবং এসি বার্থ ১,০৮১ টাকা। ঢাকা থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, নভোএয়ার ও ইউ এস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান সেবা চালু আছে। জনপ্রতি ভাড়া সর্বনিম্ন ২৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৮২০০ টাকা। সড়ক ও রেলপথে ৭ থেকে ৮ ঘন্টা সময় লাগলেও ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে প্লেনে সময় লাগে মাত্র ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট। সুতরাং যাত্রার সময় সংরক্ষণ করতে চাইলে প্লেনে চেপে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেতে পারেন। তারপর রাজশাহী থেকে বাস বা ট্রেনে করে চাপাইনবাবগঞ্জ যাওয়া যাবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থেকে সিএনজি, অটোরিকশা বা স্থানীয় যানবহনে এই মসজিদে আসা যায়। 

কোথায় থাকবেন? 

চাঁপাইনবাবগঞ্জে থাকার জন্য শহরে অনেক হোটেল আছে। যেমন:

১। হোটেল রোজ: স্টেশন রোড, (মহনন্দা বাসষ্ট্যান্ড সংলগ্ন), লাখেরাজপাড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর।

যোগাযোগ: ০১৭৬১৮৫৫৪৭১

২। লাল বোডিংঃ ঢাকা বাসস্ট্যান্ড, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

যোগাযোগ: ০১৭১৮২৭৯৮৪১

৩। হোটেল আল নাহিদ: আলহাজ রফিকুল ইসলাম শান্তিমোড়, আরামবাগ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

যোগাযোগ: ০১৭১৩৩৭৬৯০২

৪। হোটেল স্বপ্নপুরী: মো: বাবুল হাসনাত দুরুল,

আরামবাগ মোড়, বিশ্ব রোড, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

যোগাযোগ: ০১৭১১৪১৬০৪১

৫। হোটেল নাজমা: কানসাট, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

কোথায় খাবেন?

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ এর প্রচুর খাবার স্থান, হোটেল বা রেস্টুরেন্ট আছে। সকালের নাস্তা, দুপুর ও রাত সব বেলার জন্য খাবারের ব্যবস্থা আছে এইসব হোটেলগুলোতে। স্বল্প খরচে সুস্বাদু খাবারের জন্য মনির হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, মিষ্টি কালু রেস্টুরেন্ট, শাহাজাহান হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, নিউ পারফেক্ট হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট বিরিয়ানি হাউজ ইত্যাদি দোকান বেঁছে নিতে পারেন।

একটুখানি কেনাকাটা 

চাঁপাইনবাবগঞ্জে মূলত সুস্বাদু আমের বিপুল ফলন কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত। জৈষ্ঠ্য মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ভ্রমণে গেলে আপনি সেখান থেকে খুব কম খরচে প্রচুর আম কিনতে পারবেন। এছাড়াও কাঁসা, পিতল, লাক্ষা, নকশী কাঁথা ও রেশম ইত্যাদির জন্যও চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিখ্যাত। 

Leave a Comment

Our new website now under construction, It will coming soon. Do you like to get notify when the new version will be on live?

Subscribe for notifications.

You have successfully subscribed to the newsletter

There was an error while trying to send your request. Please try again.

Bangladesh Tourism Guide will use the information you provide on this form to be in touch with you and to provide updates and marketing.